Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

বাংলা আমার ধর্ষিতা জননী

শ্রেয়সী শবনম শ্রেয়া:
হ্যা, আপনি ঠিকই দেখেছেন, আমি আমার মাকে ধর্ষিতা বলেই সম্বোধন করেছি, আমি আমার বাংলা মাকে এমন একজন নারীর সাথে তুলনা করেছি–যিনি ধর্ষিত হয়েছেন, কেবল আদিতে যে হয়েছে তা নয়-বরং প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।

১৬ ডিসেম্বর,১৯৭১ সাল…
আজ থেকে মাত্র ৪৭ বছর ৩ মাস ১০দিন আগে স্বাধীন হয়েছিল আমাদের দেশটা।মাকে বাচাঁনোর জন্যে প্রাণ দিয়েছিল তার লাখ লাখ সন্তান, সম্ভ্রম হারিয়েছিল অন্তত কয়েক লাখ নারী, ছেলে হারা হয়েছিল লাখ লাখ মা, সাদা থান হাতে তুলে নিয়েছিল লাখো বর্ণপ্রিয়া নারী, মাকে পরাধীনতা নামক ধর্ষনের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েছিল মায়ের লাখো কোটি সন্তান…..

দিন পালটায়, রঙ বদলায়…..
তবে ৪৭ বছরে দিন যে এতটা পালটে যাবে তা মনে হয় দুঃস্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারেননি আমার বাংলা মা….১৯৭১ সালের আগে আমাদের মা নানা ভাবে শাসিত,শোষিত হয়েছে।অনেক রাজা-বাদশা-নবাব-সুলতানের পর বাংলা কে প্রতিনিয়ত শাসন করে গেছে বৃটিশ রাজতন্ত্র….এই অভিশাপ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে ৪৭’এ পাকিস্তানের অংশরূপে স্বাধীনতার সূর্য্য দেখে আমার বাংলা মা–বুঝতেই পারেনি এ সূর্য নিছক মরিচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়…. শুরু হয় আরেক দফা শোষণ-তথা ধর্ষণ….৪৭’ থেকে ৭১’ নানা ভাবে আবারও শোষিত হন আমার মমতাময়ী মা।যদিও ৫২’ তে আমার মায়ের ছেলেরা গর্জে উঠেছিল,তবে সে গর্জনে কেবল ভাষা পেলেও-পারেনি মায়ের হাতে পায়ে পরানো সেই বেড়ি খুলে ফেলতে…হাজার বঞ্চনার শিকার হয় আমার মা,শোষণ,শোষণ এবং শুধুই শোষণ…

১৯৭১ সাল–
মাঠে নামে মায়ের দামাল সামাল ছেলেরা, ৯ মাস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নেয়, মুক্তির সাধ পায় আমার মা, ওই বিশাল আকাশের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেয় সে, নেয় প্রাণ ভরা শ্বাস–যদিও মুক্তির সাধ পেয়েছিল তার ৩০ লাখ সন্তানের রক্তগঙ্গায় স্নান করার মাধ্যমে… সে যাই হোক….

আমার লেখার শুরুতেই আমি বলেছিলাম, “কেবল আদিতে যে হয়েছেন তা নয়-বরং প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন আমার বাংলা মা”—৭১’ এর আগে যতবার আমার মা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন–প্রত্যেকবার আমার মা ভেবেছে তার হাহাকার,তার সম্ভ্রম হারাবার বেদনা,তার প্রত্যকটা চোখের জলের বদলা তার ছেলেরা নেবে,মা ভেবেছে -মা ধর্ষিতা হউক,কিংবা সতী সাবিত্রী-মা তো মা’ই হয়….মায়ের কষ্ট ঠিকই তার সন্তানেরা বুঝতে পারবে….হ্যা বুঝেছিল–বুঝেছিল বলেই ৭১’ এ প্রাণ দিয়েছিল মায়ের লাখ লাখ সন্তান,বুঝেছিল বলেই যে নারী অন্দরমহলের বাইরে কোনোদিনও যায়নি-সেও হাতে রাইফেল তুলে নিয়েছিল,বৃদ্ধ বয়সের শেষ সম্বল-একটি মাত্র পুত্রকে দেশের জন্যে বিলিয়ে দিয়েছিল হাজারো বৃদ্ধা মা –কেবল আমাদের দেশ মাতৃকাকে বাঁচাতে….

আজ কোথায় গেলো সেই ভালোবাসা,আজ কোথায় গেল সেই মাতৃভক্তি, আজ কোথায় গেল সেই মাকে বাঁচাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা…?
আজ তো আমার মা প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে তার নিজ সন্তানদের দ্বারাই,আজ তো আমার মা চরম অবহেলার শিকার হচ্ছেন তার স্বীয় পুত্রদের কারণেই…আজ কোথায় হারিয়ে গেলো সেই মমতাময়ী মাকে চরম তৃষ্ণায় এক গ্লাস ঠান্ডা জলের সমান কাছে পাবার নেশা…?

আজ তো আর সেই ভালোবাসা,সেই প্রীতি,সেই শ্রদ্ধাবোধ নেই–কারণ আজ আমাদের দেশটা উন্নয়নশীল,কারণ আজ আমাদের দেশটা পড়ে থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি গুলোর মধ্যে,কারণ আজ আমাদের দেশ টা উচচ আয়ের দেশ নয়,কারণ আজ আমাদের দেশে চাকরির জন্যে হাজার টা সেক্টর খালি নেই….তাই আজ নিজের মাকে অপমান করলেও তেমন কিছু আসে যায় না,তাই আজ “”এই দেশে জন্মানোটাই ভুল”” কথাটা বলার আগে একবারো মুখে আটকায় না,তাই আজ”” কবে যে ফরেন কোনো একটা কান্ট্রিতে পাড়ি দিব””এই কথা বিনা দ্বিধায় ভাবতেও একবারো কষ্ট হয় না…আপনার নিজের মাকে করা এই প্রত্যেকটা অপমান কি ধর্ষনের সমান নয়…?কেবল একটু আরাম আয়াসে থাকার জন্যে নিজের মাকে ছেড়ে ভিনদেশে গিয়ে তাকে গালি দেওয়া কি তাকে ধর্ষণ করা হয় না…?আরে আপনার আমার দেশটা স্বাধীনতা অর্জন করেছে মাত্র কটা বছর আগে,তার উপর দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি হার + অশিক্ষিত মানুষের হার অনেক বেশী,আপনি কি করে আশা করেন এত কম সময়ে উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে নিজের দেশটাকে পাবার…?সোনার টুকরো জমিটার উপর আপনার যে পুকুরটা আছে,সেই পুকুরটা নর্দমায় পরিণত হয়েছে বলে আপনি তা বেঁচে দেবেন–এটা নিছক কাপুরুষতা ছাড়া আর কিছুই নয়….নিজের জমি,নিজের মাটি – আপনার সামান্য চেষ্টায় নর্দমা হয়ে উঠতে পারে কোনো পদ্মপুকুর….তাই আসুন না চেষ্টা করি মনের মতোন করে মা কে সাজাতে…মা তো আমাদেরই…মায়ের দুর্নাম মানে নিজেদের দুর্নাম–তাই আসুন সকল গোঁড়ামি ত্যাগ করে সঙ্ঘবদ্ধ হই এই স্বাধীনতার মাসে….
রূপে গুনে অনন্যা করে তুলি আমাদের বাংলা মাকে, আমাদের সোনার বাংলাকে….

সবাই কে মহান স্বাধীনতা দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা…..

লেখিকা
শিক্ষার্থী
বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ