Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

গানই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে চিরদিন

নিরঞ্জন রায়:
সুবীর নন্দী বাংলা গানের একজন কিংবদন্তি শিল্পী। আমাদের দেশে যে ক’জন শিল্পী আধুনিক গান গেয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছেন তাদের মধ্যে সুবীর নন্দী অন্যতম। সুবীর নন্দীর কণ্ঠের গান মানুষের মুখে মুখে। তিনি দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে গান গেয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন। অগণিত ভক্ত-শ্রোতা তার গান শুনে প্রতিনিয়ত আনন্দ পেয়ে থাকেন। আমাদের মতো অসংখ্য প্রবাসী বাঙালী সুদূর আটলান্টিকের অপর পারে থেকেও সুবীর নন্দীর গান শুনে আনন্দ লাভ করি এবং সুখ-দুঃখের নানান মুহূর্ত ভুলে থাকার চেষ্টা করি। অথচ সেই গুণী শিল্পী আজ আমাদের মাঝে নেই ভাবতেই কষ্ট লাগে। সুবীর নন্দী তার অসাধারণ গলায় বাংলা, বিশেষ করে আধুনিক বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন। সত্তর এবং আশির দশকের অনেক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান গেয়েছেন এই গুণী শিল্পী।

বেশ কিছুদিন ধরেই এই গুণী শিল্পীর নিজের কণ্ঠে পরিবেশিত গান শুনতে পাইনি। তাকে টেলিভিশনের কোন গানের অনুষ্ঠানেও দেখিনি। গত বছর একটি টেলিভিশন চ্যানেলের কোন এক গানের অনুষ্ঠানে এক শিল্পীকে ফোনে শুভেচ্ছা জানানোর সময় অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও তার গান শুনছেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। তখন তার অসুস্থ হবার বিষয়টিকে মোটেই গুরুত্ব দেইনি। কেননা মানুষ অসুস্থ হতেই পারে এবং সুস্থও হয়ে ওঠে। কয়েক মাস আগে ইউটিউবে সুবীর নন্দীর একটি গান খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ করেই গত বছর চ্যানেল আই কর্তৃক এই কিংবদন্তি শিল্পীকে আজীবন সম্মাননা প্রদানের অনুষ্ঠানটি দেখার সুযোগ হয়। সেই অনুষ্ঠানে সুবীর নন্দী আজীবন সম্মাননা গ্রহণ করে তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেই ফেললেন, তার দুটো কিডনিই আর কাজ করছে না। কথাটা শুনেই আঁতকে উঠি এই ভেবে যে, তাহলে তার কণ্ঠে মধুর মধুর গান শোনার দিন কি ফুরিয়ে আসছে। তারপরও মনে হয়নি যে তিনি এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। কেননা বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থা এমন উন্নত হয়েছে যে দুটো কিডনি বিকল হলেও মানুষ নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে খুব স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। এসব উন্নত দেশে তো বটেই, এমনকি আমাদের বাংলাদেশেও অনেকে কিডনি বিকল হবার পর নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে সকল স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যান। সেই বিশ্বাস থেকেই হয়তো তিনি সেই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তিনি এখনও আগের মতই গান করতে পারেন এবং চাইলে একটানা অনেকক্ষণ গান করে থাকেন। কিন্তু সুবীর নন্দীর সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না। তার অগণিত ভক্ত, শুভাকাক্সক্ষী, সহকর্মী, সরকার এবং দেশবিদেশের অনেক প্রখ্যাত চিকিৎসকদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি থেমে গেলেন মাত্র সাতষট্টিতে এসে।

শখের বশবর্তী হয়ে গান শিখলেও পরবর্তী সময়ে তার মেধা, মনন, সৃষ্টিশীলতা এবং সাধনার মাধ্যমে একজন কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান এবং মানুষের অফুরন্ত ভালবাসাও লাভ করেন। তিনি দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে বহু জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। তার গানের সংখ্যা আড়াই হাজারের মতো। সুবীর নন্দীর গানের বিশেষত্ব হলো, তার গাওয়া প্রতিটা গান সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং সব গানই সকল স্তরের মানুষের মন জয় করে কালজয়ী গান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক শিল্পী আছেন যাদের গাওয়া প্রতিটা গান সমান জনপ্রিয়তা পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিল্পীরা হাতেগোনা কিছু জনপ্রিয় গান গাওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। এই ক্ষেত্রে সুবীর নন্দী একজন ব্যতিক্রমধর্মী শিল্পী যার কণ্ঠের সকল গান জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছে। বাংলা গানের জগতে মান্নাদে এবং সুবীর নন্দীই সম্ভবত দু’জন গুণী শিল্পী যারা সীমিত সংখ্যক বাংলা গান গেয়ে দীর্ঘদিন দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন এবং তাদের দু’জনের সকল গানই সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সুবীর নন্দী গান গেয়ে যেমন সার্থক, তেমনি স্বীকৃতিও পেয়েছেন তার জীবদ্দশাতেই। জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পেয়েছেন পাঁচবার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। চ্যানেল আই কর্তৃক প্রদত্ত আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন গত বছর। সবশেষে জাতীয় পুরস্কার একুশে পদকও পেয়েছেন এ বছর। নিজে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন যান সুবীর নন্দীর মতো একজন বরেণ্য শিল্পীর জন্য বড় পাওয়া। অনেক গুণী শিল্পী তাদের জীবদ্দশায় এরকম জাতীয় পুরস্কার পাননি, পেয়েছেন মারা যাবার পর মরণোত্তর পুরস্কার। সেই দিক থেকে সুবীর নন্দী সৌভাগ্যবান। তিনি সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার জন্য যেভাবে সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে প্রেরণ করেন, সেটিও তিনি নিজে দেখে যেতে পারলেন- যা একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় পাওয়া।

সুবীর নন্দীর মতো গুণী শিল্পী যুগে যুগে তৈরি হয় না। যে সময় বাংলা সঙ্গীত সুবীর নন্দীর হাত ধরে আরও সমৃদ্ধ হতে পারত, ঠিক সেই সময় তিনি চলে গেলেন তার অগণিত ভক্ত-শ্রোতাকে কাঁদিয়ে। সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে বাংলা সঙ্গীতের যে ক্ষতি হয়ে গেল তা খুব সহসা পূরণ হবে না। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

লেখক : ব্যাংকার. টরেনটো, কানাডা