Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনা

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক:
দেশের যাঁরা সেরা কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক, দার্শনিক, সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, চিন্তাবিদ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অসামান্য অবদান রেখেছেন, ত্যাগের মহিমায় যাঁরা অনন্য তাঁদেরকেই সাধারণত স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়ে থাকে। বলা যেতে পারে বাংলাদেশের যাঁরা শ্রেষ্ঠ সন্তান স্বাধীনতা পুরস্কার তাঁদের জন্য এক মহাসম্মান এবং স্বীকৃতি। বাংলাদেশে যতগুলো জাতীয় পুরস্কার আছে, তার মধ্যে স্বাধীনতা পুরস্কারই সর্বোচ্চ পুরস্কার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাঁদের কৃতী সন্তানদের বিভিন্ন নামের পুরস্কার দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কারের তালিকায় রয়েছে নোবেল পুরস্কার। বিশ্বের সেরা মানুষদেরকেই নোবেল পুরস্কার দেয়ার কথা। নির্বাচনী বোর্ড তাঁদের বিবেচনায় যাঁদেরকে যোগ্য বলে বিবেচনা করেন, তাঁরাই নোবেল পুরস্কার পেয়ে থাকেন। নোবেল পুরস্কার যাঁরা পেয়েছেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন যে কিছু ওঠেনি, এমন কথা বলা যাবে না। আমাদের দেশে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রবর্তিত হয় ১৯৭৭ সালে। জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজসেবা, গবেষণা সব মিলিয়ে মোটামুটি ১৩টি ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে। ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হিসেব করে দেখা গেছে ব্যক্তি হিসেবে স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন ২৮৩ জন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান।

স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান কমিটিতে যাঁরা থাকেন, তাঁদের মেধা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবার তেমন সুযোগ নেই। তবে যে সরকার যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন, পুরস্কার নির্বাচনী কমিটি সেই সরকারের রাজনৈতিক দর্শন থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পেরেছেন তেমনটি মনে হয় না। প্রসঙ্গক্রমে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে।

১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন সর্বপ্রথম স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান শুরু করেন নিজ চেতনাধারীদের দিয়েই। ১৯৮১ সালে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি হবার পর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত যাঁরা স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন, জেনারেল এরশাদের চিন্তা-চেতনা এবং পছন্দের প্রতিফলন কোন কোন ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে জেনারেল জিয়ার তুলনায় জেনারেল এরশাদ স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের ব্যাপারে কিছুটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পেরেছিলেন বলে মনে হয়। তাঁর সময়ে পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা তুলনামূলকভাবে একটু ক্ষুদ্র হয়ে গেছে। ১৯৮৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকায় নাম রয়েছে মাত্র একজনের, তিনি মরহুম জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী (মরণোত্তর), পুরস্কারের ক্ষেত্র-সমাজসেবা। লক্ষ্য করবার বিষয়, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, এমন কি খালেদা জিয়ার ১৯৯৫ সালের শাসনকাল পর্যন্ত স্বাধীনতা এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাউকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবার পর স্বাধীনতা পুরস্কারের ক্ষেত্রে কিছুটা মৌলিক পরিবর্তন আসে। ১৯৯৮ সালের তালিকায় দেখা যায় সর্বমোট ১০ জনের মধ্যে ৭ জনেরই স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্র ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’। তাঁরা সবাই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ৩ নবেম্বরে শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে যাঁরা স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বমোট ১৮ জনেরই পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্র ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’।

বেগম খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে পুরস্কার প্রদানে আওয়ামী লীগ সরকার প্রবর্তিত ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’ শাখাটিতে কোন রকম পরিবর্তন আনেননি। বেগম খালেদা জিয়া সরকারের আমলে ২০০২ সালে ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’ শাখায় যাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়, তিনি এস এ বারী এ.টি (মরণোত্তর)। ২০০৩ সালে খালেদা জিয়ার শাসনকালেই বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় আর কাউকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়নি। ২০০৩ সালের তালিকায় উল্লেখ আছে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (মরণোত্তর)’। তাঁকে পুরস্কার দেয়া হয়েছে ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’ শাখায়। বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে চিহ্নিত করা এবং স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়ার পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কি কৌশল বা অভিপ্রায় ছিল তা বোধগম্য নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যাঁরা স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তির তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায় ব্যক্তির চেয়ে সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোই সেখানে প্রাধান্য লাভ করেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং আওয়ামীপন্থী শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীবৃন্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল মতিন চৌধুরী এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলামের নাম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। প্রায় দীর্ঘ তিন বছর অন্যায়ভাবে তাঁদেরকে জেলখানায় বন্দী করে রাখা হয়। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে মুক্ত হয়ে এসে আশির দশকের শুরতেই তাঁরা গঠন করেন ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’। প্রফেসর ড. আবদুল মতিন চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’র শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়ে দেশে বিদেশে। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর ইতিহাস বিকৃতির যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়, সেই ষড়যন্ত্র ঠেকাতে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’র মাধ্যমে আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীগণ এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশে আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের যুদ্ধ করতে হয়েছে দু’বার। ১৯৭১ সালে ৯ মাস এবং বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একুশ বছর। অথচ তাঁদের এই অবদানের কোন মূল্যায়ন নেই। স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির ব্যাপারে আওয়ামীপন্থী যে সমস্ত বুদ্ধিজীবী উপেক্ষিত হয়েছেন উদাহরণ হিসেবে তাঁদের কিছু নাম আমি এখানে তুলে ধরছি।

১. বিচারপতি কে এম সোবহান। বংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে যেমন তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধু পরিষদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন।

২. প্রফেসর মযহারুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে ভারতে গিয়ে ৯ মাস তিনি মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর মযহারুল ইসলামকে তৎকালীন জিয়া সরকার তিন বছর কারারুদ্ধ করে রাখে।

৩. প্রফেসর মশাররফ হোসেন। যিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অসাধারণ অবদান রেখেছেন। তাঁর মতো অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশে খুব কমই আছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে বিদেশে বঙ্গবন্ধু পরিষদের শাখা-প্রশাখা গঠনের তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৪. ড. ওয়াজেদ মিয়া, যিনি পরমাণু বিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘকাল তাঁকে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জামাতা হিসেবে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যে সংগ্রাম তিনি চালিয়ে গেছেন তার তুলনা হয় না। ৫. প্রফেসর হবিবুর রহমান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের খ্যাতনামা অধ্যাপক। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী একজন দৃঢ়চেতা বুদ্ধিজীবী।

৬. ডা. এস এ মালেক। ১৯৭১ সালে ভারতে গিয়ে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁকে জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সকলের কথা লিখতে গেলে তালিকা বেশ দীর্ঘ হয়ে যাবে। আমি যাঁদের কথা লিখলাম তাঁরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিষ্ঠাবান বুদ্ধিজীবী এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। তাঁরা সবাই আন্তর্জাতিক মানের খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবী। সে বিবেচনাতেও তাঁরা স্বাধীনতা পুরস্কার লাভের যোগ্যতা রাখেন।

আরেকটা বিষয়, স্বাধীনতা পুরস্কার যাঁরা পাবেন, তাঁদেরকে যদি পুরস্কারের জন্য আবেদন করতে হয়, সেটি অত্যন্ত বিব্রতকর। নির্বাচনী বোর্ডে যাঁরা থাকবেন, তাঁদেরই দায়িত্ব হবে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তিদেরকে খুঁজে বের করা। আমাদের এই ছোট দেশে যোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। প্রয়োজনবোধে স্বাধীনতা পুরস্কার বাছাই পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা বাঞ্ছনীয়।

লেখক : সাবেক ভিসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়