Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

স্বপ্নের ভেতর জন্ম নেয়া কবি আবিদ আজাদ

শাকিল রিয়াজ:
‘ঘাসের ঘটনা’ কাব্যগ্রন্থ আমার কৈশোর এলোমেলো করে দিয়েছিল। ওহো, কবিতা তাহলে এমনও হয়! সুড়সুড় করে টেনে নিয়ে যেতে পারে স্বপ্নের ভেতর? জেগে থেকেই?

দূরের এই নক্ষত্রকে একসময় কাছে থেকে চিনলাম। বন্ধুত্ব দৃঢ হলো, পারিবারিক হলো। একজন আপাদমস্তক কবির দিনযাপন অনুসরণ করার ভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি কবি আবিদ আজাদ। তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল।

কতকিছু লেখার আছে তাঁকে নিয়ে অথচ কিছুই লিখতে পারছি না!

আমি মনে করি আবিদ আজাদ বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কয়েক কবির একজন। জীবনানন্দের পাশে তাঁকে রাখতে আমার দ্বিধা নেই। গতকাল (২২ মার্চ) কবির মৃত্যুদিনটি চলে গেল নিভৃতে, শোরগোলহীন, আয়োজনহীন। এটা আমাদের দীনতা।

আমার সৌভাগ্য আমি আবিদ ভাইর পঞ্চাশতম জন্মোৎসব আয়োজনে সক্রিয় ছিলাম। আমি ছিলাম সেই জমকালো আয়োজনের সদস্য সচিব। আহ্বায়ক ছিলেন কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে জড়ো করেছিলাম সমকালীন বিখ্যাত কবি-লেখকদের। আবিদ ভাইর অনিচ্ছা ছিল, কিন্তু আমি, শান্তা, মিলি, শাহীনের ইচ্ছার কাছে তাঁর সে অনিচ্ছা মার খেয়েছিল। এখন মনে হয়, আয়োজনটা না করলে আমাদের অনেক আফসোস থেকে যেতো।

অসুখটা খুব ভুগিয়েছিল কবিকে। বিদেশে চলে আসার পরও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। আবিদ ভাইর ছেলে, আমাদের আদরের বাবু মেইল করতো, আঙ্কেল, বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে। বাবাকে মনে হয় বাঁচানো যাবে না। প্লিজ বাবাকে বাঁচান।

বাবু তখন সবে কলেজে উঠেছে। মা হারা এই ছেলেটি বাবাকে হারাতে বসেছে। আমার বুক হুহু করে ওঠে। আবিদ ভাইর সঙ্গে কথা হলে তিনি তাঁর শ্বাসকষ্টের ব্যাধি নিয়ে মস্করা করতেন। ঠাট্টার ছলেই চলে গেলেন হুট করে। একেবারেই।

আমার চতুর্থ কবিতার বই “নিজের ছায়াকে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে মজা লুটি” বের করেছিলেন আবিদ ভাই তাঁর শিল্পতরু প্রকাশনী থেকে। আগেভাগে বলে রাখলেন, আপনার বন্ধু তারেকের কাজ আমার ভাল লাগে। প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ ওকে দিয়ে করিয়েন। করিয়েছিলাম।

বইটি ভাল চলেছিল বলে হোটেলে ঘটা করে খাইয়েছিলেন। একটি প্রবন্ধের বই পাণ্ডুলিপিও তিনি নিয়েছিলেন বের করবেন বলে। শিরোনাম ছিল “আত্মহত্যার স্বপক্ষে ও অন্যান্য”। তিনি যখন হাসপাতালে, বইটি তখন প্রেসে। উৎসর্গ আবিদ ভাইকেই।

আবিদ ভাই খুব স্নেহ করতেন আমাকে। মনে করতেন, আমি খুব ভালো একটি ক্যারিয়ার গড়েছি। বলতেন, বাবুকেও আমি জার্নালিজমে পড়াবো। আপনার মতই সাংবাদিক হবে সে। আমি লজ্জা পেয়ে বলতাম, অথচ আমি আপনার মত কবি হতে চাই। আমি আপনার মত হতে পারিনি কিন্তু বাবু আপনার স্বপ্ন ছাড়িয়ে এখন অনেক বড় সাংবাদিক।

আবিদ আজাদ স্বাধীনতা উত্তর বাংলা কবিতার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কবিতার একটি নিজস্ব ঘরানা আছে, আছে একান্ত একটি ঘোর। নিতান্তই আবিদীয়। ঠিক যেমন জীবনানন্দের একটি একান্ত জগৎ ছিল। আমি যতবার আবিদ আজাদের কবিতা পড়ি ততবারই চমকিত হই, আলোড়িত হই, আন্দোলিত হই, শিহরিত হই। তাঁর স্বপ্নের জগতে জেগে উঠেছিলাম সেই কবে। আর ফিরতে পারছি না।

আবিদ আজাদের কবিতা নিয়ে বিপুল আলোচনা না হওয়াটা রহস্যময়। জীবনানন্দ দাশও তাঁর সমকালে উপেক্ষিত ছিলেন। কিন্তু সময় ঠিকই তাঁকে ছেকে বের করে এনেছে। আবিদ আজাদের কবিতার যে বিশাল জগত, যে শক্তিমত্তা, যে আলো, তা খুব বেশিদিন উপেক্ষার অন্ধকারে আটকে রাখা যাবে না।

প্রিয় কবিকে সশ্রদ্ধ সম্মান ও ভালোবাসা জানাই তাঁরই কবিতার স্পর্শে:

স্বপ্নের ভিতর আমার জন্ম হয়েছিল
সেই প্রথম আমি যখন আসি
পথের পাশের জিগা-গাছের ডালে তখন চড়চড় করে উঠছিল রোদ
কচুর পাতার কোষের মধ্যে খণ্ড-খণ্ড রুপালি আগুন
ঘাসে-ঘাসে নিঃশব্দ চাকচিক্য-ঝরানো গুচ্ছ গুচ্ছ পিচ্ছিল আলজিভ
এইভাবে আমার রক্তপ্রহর শুরু হয়েছিল
সবাই উঁকি দিয়েছিল আমাকে দেখার জন্য
সেই আমার প্রথম আসার দিন
হিংস্রতা ছিল শুধু মানুষের হাতে,
ছিল শীত, ঠাণ্ডা পানি, বাঁশের ধারালো চিলতা, শুকনো খড়
আর অনন্ত মেঝে ফুঁড়ে গোঙানি –
আমার মা
স্বপ্নের ভিতর সেই প্রথম আমি মানুষের হাত ধরতে গিয়ে
স্তব্ধতার অর্থ জেনে ফেলেছিলাম,
মানুষকে আমার প্রান্তরের মতো মনে হয়েছিল-
যে রাহুভুক।
অন্যমনস্কভাবে আমার এই পুনর্জন্ম দেখেছিল
তিনজন বিষণ্ন অর্জুন গাছ।
সেই থেকে আমার ভিতরে আজও আমি স্বপ্ন হয়ে আছি-
মা, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি জন্ম নেব কবে?
(জন্মস্মর)