Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

মানসিক যন্ত্রণা

শ্রেয়সী শবনম শ্রেয়া:
আমি একজন খুব সাধারণ মানুষ। আমার বেড়ে ওঠা আমার বয়সী আর কয়েকটি সাধারণ মেয়ের মতোনই খুব সহজ সরল এবং প্রাঞ্জল। আমার অস্তিত্বকাল বলুন কিংবা জীবন কে দেখার অভিজ্ঞতা-দুটোই খুবই কম, কিংবা বলা যেতে পারে খুবই সীমিত। তবুও এই অল্প কয়েকদিনে আমার মনের গভীরে যে বিষয়টি সব চাইতে গভীরভাবে দাগ ফেলেছে সেটা হলো যন্ত্রনা-মানসিক যন্ত্রণা বা মানসিক পীড়া।

আমার মতে, মানসিক যন্ত্রনা বা পীড়ায় ভোগা কোনো অসুখ বা রোগ নয়। এটি হলো একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবসাদগ্রস্ততা কিংবা বলা যায় মানুষের কনসাস মাইন্ড এর পরাজয় অথবা অবচেতন মনকে নিজের আত্মার শক্তির বিরুদ্ধে কাজ করতে দেওয়া। প্রাত্যহিক জীবনে নানা কারণে আমরা এই ধরণের যন্ত্রণার সম্মুখীন হই। আমরা ভুলে যাই নিজের অস্তিত্ব, ভুলে যাই নিজের কথা, ভুলে যাই আমাদের স্পিরিচুয়াল পাওয়ার কে। আসলে ভুলে যেতে যেতে আমরা নিজেদেরকেই সবচেয়ে বেশী করে ঠকিয়া ফেলি। নষ্ট করে দিই আমাদের সেই প্রচ্ছন্ন শক্তিকে যা কিনা পারতো নেতৃত্ব দিতে, যা কিনা পারতো নিজেকে উন্নত করতে, যা পারতো নিজের জাতিকে উন্নত করতে। সর্বোপরি যা পারতো গোটা বিশ্বে এর ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে।

অথচ আমরা এই ব্যাপারে একেবারেই নির্বিকার চিত্ত। আমরা নিজেদের কথা ভুলে যাই, প্রশ্রয় দেই আমাদের অবচেতন মনের সেই শক্তিকে যা কি না তিল তিল করে শেষ করে দেয় আমাদের স্বীয় সত্ত্বা কে। মনের গভীরে সৃষ্টি করে তার সমর্থিত একটি সত্ত্বা। অর্থাৎ সেই মানুষটি তখন নিজের অজান্তেই দ্বৈত সত্ত্বার ধারক। তার ভেতর ক্রমাগত চলে দ্বৈত সত্ত্বার দ্বন্দ্ব যুদ্ধ। আর ঠিক তার পরেই মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করে, নিজেকে হেয় ভাবতে শুরু করে। একটা সময় আসে যখন সে যে একজন মানবিক গুনাবলী, বিচার-বিবেচনা, বিচক্ষণতা সম্পন্ন মানুষ সেই বোধই হারিয়ে ফেলে। আর তখন সে এমন এক অনুভূতির দ্বারা পরিচালিত হয় কিংবা এমন এক পরিস্থিতির স্বীকার হয় যাকে আমরা ডিপ্রেশন নামে অভিহিত করে থাকি।

এখন কথা হলো তবে কেন এমন হয়? কেন আমরা এমন পীড়ায় ভুগি? আমার ভাষায় অল্প কথায় সাবলীল রূপে বলতে হলে বলবো, যখন একজন মানুষ তার নিজের উপর থেকে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে কিংবা যখন সে নিজের সত্ত্বা কে বিচার করবার বিবেচনা বোধ হারিয়ে ফেলে কিংবা যখন সে নিজের স্বীয় সত্ত্বাকে অন্যের উপস্থাপিত সত্ত্বা হিসেবে দেখে এবং নিজের মনের দৃষ্টিতে তৈরী আগের সত্ত্বার সাথে মেলাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় তখনই এরূপ পরিস্থিতির উদ্রেক হয়।

এই অবস্থা চলতে চলতে এমন একটা সময় আসে যখন মানুষ নিজের আমিত্বকে সম্পূর্ণরূপেই হারিয়ে ফেলে, বার বার খুঁজতে গিয়েও খুঁজে পায় না। একটা অসহনীয় যন্ত্রণা সৃষ্টি হয় তার ভেতর। আগের আমিকে ফিরে না পাবার এক প্রবল মনস্তাপে ভুগতে শুরু করে সে। একটা সময় আসে যখন গোটা পৃথিবীটাকেই বড় অচেনা লাগতে শুরু করে, সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোকেই তখন সবচেয়ে দূরের বলে মনে হয়। এক দুঃসহ চিত্তদাহ তাকে এতটাই তাড়া করে বেড়ায় যে এ থেকে পরিত্রাণ পাবার একমাত্র উপায় তার কাছে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। একটা সময় আসে যখন সে বাধ্য হয় আত্মহুতি দেবার।

ডিপ্রেশন নামক এই অভিশাপ আমাদের দেশের তরূণ সমাজের মাঝেই বেশী। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি মুগ্ধতা আসা-তা থেকে এক সম্পর্কে জড়ানো, এর পর এক পর্যায়ে সম্পর্কে বনিবনা নাহলে ব্রেক আপ — ডিপ্রেশন — আর সব শেষে আত্মহত্যা। এছাড়া বর্তমান অবস্থায় ভালো ফল করেও চাকরি না পাওয়া, দাম্পত্য কলহ, একাকীত্ব এসবের ফল বর্তমানে আত্মহত্যাই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতি লাখে আত্মহত্যার হার ৭.৮ জন, প্রতি লাখে পুরুষদের আত্মহত্যার হার ৬.৮ জন, নারীদের বেলায় ৮.৭ জন। এসব আত্মহত্যার মূল কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সব কিছুর পেছনে একটি মাত্র বস্তুই রয়েছে তা হলো ডিপ্রেশন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে,এ থেকে পরিত্রানের কি কোনো উপায় নেই? ইংরেজিতে একটি কথা আছে তা হলো ‘Nothing is impossible, the word itself says ‘I’m possible’!’ অর্থাৎ কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। অসম্ভব শব্দটি স্বয়ং বলে ‘আমি সম্ভব’। অতএব যদি সমস্যা বলে কোনো শব্দ পৃথিবী তে থেকে থাকে, তবে সে সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় ও বর্তমান।

অর্থাৎ একজন মানুষ যদি নিজের জীবনের সকল মানুষিক জটিলতা থেকে মুক্ত হতে চায় তবে তা সে অবশ্যই পারবে। পৃথিবীতে কোনো কিছুই নিজে থেকে এসে ধরা দেয় না, কাঙ্ক্ষিত বস্তুটিকে অর্জন করে নিতে হয়। তাই যদি কেউ ডিপ্রেশন নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে চায় তবে সবার আগে ভালোবাসতে হবে নিজেকে। শুনতে হবে নিজের মনের কথা, দাম দিতে হবে নিজের ইচ্ছেকে। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে, অবসর সময়টাকে প্রফুল্লতায় ভরে দেবার চেষ্টাও নিজেকেই করতে হবে। এমন একটি গঠনমূলক কাজে নিজেকে জড়াতে হবে যা কিনা একজন মানুষের মনকে কেবল একটি কাজে ফোকাস করতে সাহায্য করবে। কাজটি হতে পারে বই পড়া, ছবি আকা, লেখালিখি করা ইত্যাদি।

নিজের মা বাবা তথা পরিবার কে সময় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে পরিবারের চেয়ে আপন কেউ হয় না, কারণ আপনি যখন কথা বলতে পারতেন না, হাঁটতে পারতেন না, খেতে পারতেন না তখন এরাই আপনাকে যত্ন করে কথা বলা শিখিয়েছে, হাটতে শিখিয়েছে। সেই ছোট্ট আপনাকে নিঃস্বার্থভাবে আজ এতো বড় করেছেন।

নিজেকে ভালোবাসুন, দেখবেন সারা দুনিয়া আপনাকে ভালোবাসছে। কখনো নিজেকে ছোট ভাববেন না, যদি তাই হতো তবে সৃষ্টিকর্তা আপনাকে মানুষ হিসেবে পাঠাতেন না।

সবার সুস্থ জীবনই আমাদের একান্ত কাম্য।

লেখক
শিক্ষার্থী
বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ