Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও কিছু কথা

মোহাম্মদ নুরুল্লাহ::
‘‘A great teacher is like a candle— it consumes itself to light the way for others.’’
আমাদের শিক্ষানবিশী চলতেই থাকে জীবনভর। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ দিনটি শিক্ষক সমাজের জন্য অত্যন্ত গৌরবের ও মর্যাদার দিন। শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর, জাতির বিবেক। তাদের এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর এ দিবসটি পালনের মাধ্যমে শিক্ষকদের সম্মান জানানো হয়। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়র ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী বছর থেকে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ সদস্যের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর উদ্যোগে এ দিবসটি বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। কেবল দিবস পালনের মাধ্যমে শিক্ষকদের সম্মান জানানোই যথেষ্ট নয়, শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করাও বাঞ্চনীয়।

শিক্ষকদের প্রাপ্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও যথাযোগ্য সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা প্রতিটি রাষ্ট্রেরই কর্তব্য। কেননা একটি রাষ্ট্রকে আমূলে বদলে ফেলতে পারে শিক্ষকরাই। শিক্ষকতা নিছক কোনো চাকরি নয়, এ মহান এক পেশা, এক মহান ব্রত যার ওপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। শিক্ষক শিক্ষার আলো চারদিকে ছড়িয়ে দেন তার মহতী চেতনা ও প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে, তৈরি করেন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মসৃণ পথ। সেই পথ ধরেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এগিয়ে যায় সম্মুখপানে, এগিয়ে যায় সমাজ ও রাষ্ট্র।

পিতা-মাতার পরই শিক্ষকের স্থান। শিক্ষকই পারেন একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শবান, কর্তব্যনিষ্ঠ, মূল্যবোধ ও মানবিকবোধ সম্পন্ন, নিরলস পরিশ্রমী, নির্ভীক, সুশৃঙ্খল, জ্ঞানী, আধুনিক ও গতিশীল মনের অধিকারী মানুষে পরিণত করতে। অবশ্য এই গুণগুলো ওই শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারেন, যিনি ওই গুণাবলিগুলো নিজের মধ্যে ধারণ ও প্রয়োগ করতে সক্ষম। যে শিক্ষকের মাঝে এই গুণাবলিগুলো বিদ্যমান, আমরা তাকে আদর্শ শিক্ষক বলি। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রেরণার অন্যতম উৎস।

একজন আদর্শ শিক্ষক নিজের অর্জিত জ্ঞানভাণ্ডারকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি করে আন্তরিকতা ও একাগ্রতার মাধ্যমে কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠাদান, অনুশীলন প্রস্তুত, মূল্যায়ন ও সহপাঠক্রমই পরিচালনা করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বোপন করে চলেন মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেমসহ আদর্শ মানুষে পরিণত হওয়ার সব গুণাবলি। শিক্ষকতায় নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উন্নতির জন্য সর্বদা থাকেন সজাগ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাখেন সুসম্পর্ক এবং শিক্ষার্থীদের কাছে অবতীর্ণ হন রোল মডেল তথা পথপ্রদর্শক হিসেবে। কিন্তু আজকে এই ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। যার ফলে আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে জ্ঞান-মেধাশূন্য, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধহীন এক অসুস্থ প্রজন্মের দিকে আমাদের ধাবিত হওয়ার।

আজকের সময়ে গুণগত শিক্ষা নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এর অন্যতম একটি কারণ আদর্শ ও মানসম্মত শিক্ষকের ঘাটতি। এই ঘাটতির কারণ বহুবিদ। তবে সর্বাগ্রে বলা যায়, কিছু শিক্ষক আছেন যারা একে কেবল নিছক চাকরি ও অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে দেখছেন, ব্রত হিসেবে নয়। ফলে নিজেদের প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে এরা কেবল অর্থের পেছনেই ছুটতে থাকেন। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার একটা বিষয়। আবার কিছু শিক্ষকের দুর্নীতি, অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণ, রেষারেষি, প্রশ্নফাঁস, কম নম্বর ও বেশি নম্বর দেওয়া, শিক্ষার্থীদের ব্ল্যাকমেইল করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া, শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির মতো সংবাদ আমাদের পিলে চমকে দেয়।

এ ছাড়া আরও নানারকম অসঙ্গতি আমরা অনেক শিক্ষকের মাঝে দেখতে পাই। ফলে কমে যায় শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। জাপানের একটা প্রচলিত প্রবাদ হল—‘‘Better than a thousand days of dilligent study is one day with a great teacher’’.

এ কথা বহুলাংশে সত্যি যে শিক্ষকতা এমনই এক পেশা যাকে একসময় বলা হত সব পেশার চেয়ে অন্যতম।

সে যাই হোক। শিক্ষক দিবস আমাদের কাছে আজও একটা মহান দিবস হিসেবেই সূচিত হয়।

লেখক: সহসভাপতি, অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেস ক্লাব